Header Border

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২রা জুন, ২০২০ ইং | ১৯শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ (গ্রীষ্মকাল) ৩১°সে

৫০ দশকে সিনেমার অপর নাম ছিল বই ; জিবলু রহমান

দৈনিক পার্বত্য কন্ঠ

চলচ্চিত্র একটি শক্তিশালী গণমাধ্যম। শুধু বিনোদনের ক্ষেত্রে নয় বরং এটি জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং সমাজকে এগিয়ে নিতে এ মাধ্যমটির ভূমিকা বিশেষ গুরুত্ববহ। আমাদের সমাজ, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং প্রাত্যহিক চালচিত্র সুন্দরভাবে ফুটে ওঠে ছায়াছবি, তথা চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। এই মাধ্যমটির প্রতি আমাদের সবার যেমন রয়েছে স্পর্শকাতরতা, তেমনি রয়েছে অনিন্দ্য ভালোবাসা। চলচ্চিত্র শিল্পের সঙ্গে জড়িত রয়েছে অনেকের জীবন ও জীবিকা।
১৯৫৭ সালে ঢাকায় প্রথম নির্মিত হয় আব্দুল জব্বার খান পরিচালিত ছবি মুখ ও মুখোশ। পঞ্চাশের দশকে এই দেশে ভারতীয় ছবি, হলিউডের ইংরেজি ছবি ও পাকিস্তানী ছবির অবাধ প্রদর্শন ছিল। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের মধ্যভাগ পর্যন্ত তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্যে ঢাকা এফডিসি থেকে নির্মিত অনেক ভালো ছবি নির্মিত হয়। দর্শকরা গ্রহণ করে। ষাটের দশকের শুরু থেকে সত্তরের দশকের মধ্যভাগ পর্যন্ত উচ্চবিত্ত মধ্যবিত্ত নি¤œবিত্ত অর্থাৎ সকল শ্রেণির মানুষের বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম ছিল সিনেমা। সিনেমা দেখার কথা উঠলেই বলা হতো ‘চলো বই দেখে আসি’। সেদিনের সিনেমার গল্পের বুনন এতটাই শক্তিশালী ছিল যে সিনেমা মানুষের হৃদয়ে গেঁথে যেত। গল্পই ছিল ছবির প্রাণ। চলচ্চিত্র ছিল বিনোদনের সঙ্গে ইতিহাস ঐতিহ্য সংস্কৃতি ও সমাজ সংস্কারের বড়ো মাধ্যম।

নূহ-উল-আলম লেনিন লিখেছেন, ষাটের দশক উপমহাদেশে বাংলা চলচ্চিত্রের ‘স্বর্ণযুগ’ বলা যেতে পারে। ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের আগে পর্যন্ত, ভারতীয় বাংলা ও হিন্দি ছায়াছবি এখানে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ব্যাপকভাবে প্রদর্শিত হতো। পশ্চিমবঙ্গ, ভারতে যেমন, তেমনি তৎকালীন পূর্ববঙ্গ বা পূর্ব পাকিস্তানেও উত্তম-সুচিত্রা, সৌমিত্র-অপর্ণা, বিশ্বজিৎ-সাবিত্রী (অন্য কেউও হতে পারে) জুটি বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। বাংলাদেশেও শুরুটা আশাপ্রদ ছিল। এখানে সপরিবারে দেখার মতো বাণিজ্যিক কাহিনিচিত্র তৈরি হতে থাকে। তখনকার বাস্তবতায় এখানেও শক্তিমান অভিনেতা-অভিনেত্রীদের জনপ্রিয় জুটি গড়ে ওঠে। শিল্পমানের দিক থেকেও বাংলাদেশের ছবি ফেলনা ছিল না। প্রতিভাবান সব চলচ্চিত্র নির্মাতার আবির্ভাব হয়েছিল। উচ্চশিক্ষিত, পরিশীলিত রুচি এবং বৈদগ্ধ্যের অধিকারী বিখ্যাত সব চলচ্চিত্র নির্মাতা আব্দুল জব্বার খান, ফতেহ লোহানী, সালাহউদ্দিন, এহতেশাম, জহির রায়হান, কলিম শরাফী, সুভাষ দত্ত, বেবী ইসলাম, মহীউদ্দিন, মুস্তাফিজ, কাজী জহির, খান আতাউর রহমান প্রমুখ বাংলা চলচ্চিত্রের একটা চমৎকার ঐতিহ্য গড়ে তোলেন। (সূত্র : চলচ্চিত্রের উদ্ভব ও বিকাশ, উত্তরণ, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মুখপত্র)
বৃর্টিশযুগের শেষ সময় ও পাকিস্তান আমলের শুরু সবসময়ই কিন্তু আমাদের চলচ্চিত্রে লোককাহিনীভিত্তিক ঘটনাগুলোকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হতো। যার বর্তমানে লোকসংগীত হিসেবে ব্যাপকভাবে পরিচিত। বাঙালির প্রাণের এই সম্পদ লালন ও প্রচার করার ক্ষেত্রে তৎকালীন চলচ্চিত্র গুলোর ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে। বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্যমগতি লোকজীবনের সন্ধান করতে লোক কাহিনিভিত্তিক চলচ্চিত্রের কাছে বার বার ফিরে যেতে হয়।

‘রূপবান’, ‘বেহুলা’, ‘রাখালবন্ধু’, ‘সাতভাই চম্পা’, ‘কাজলরেখা’, ‘গুনাইবিবির পালা’ প্রভৃতি চলিচ্চত্রেতো গ্রাম বাংলার কাহিনী তুলে ধরা হয়েছিল। ‘রূপবানে’ লোকাচার ও লোকঅনুষ্ঠান হিসেবে গুরুত্ব পেয়েছে বিয়ের অনুষ্ঠান, বাসররাত, লোকবিশ্বাস প্রভৃতি। লোকসুরের আধিক্য এবং দ্বন্ধমুখর কাহিনির কারণে রূপবান বাঙালির লোকজীবনের চিরায়ত রূপরেখা হয়ে উঠেছে।
বেহুলার কাহিনী সনাতন জীবনধারায় নিবিড়ভাবে মিশে আছে। রাখালবন্ধু কাহিনিতে লোকসঙ্গীতের প্রয়োগের মাধ্যমে এই কাহিনীকে লোকজীবঘনিষ্ঠ করে তোলা হয়েছে। গ্রামের পরিবেশ, নদীতীর গরুচরানোর মাঠ, নৌকাবিলাস, পালকিযাত্রা সবকিছু মিলিয়ে লোকজন আবহ সৃষ্টির চেষ্টা রয়েছে। সাতভাই চম্পা চলচ্চিত্রে লোকজীবনের আখ্যান বর্ণিত হয়েছে। রানীদের চক্রান্তের জাল ছিন্ন করে ছয় লেলে ও এক মেয়ে ফিরে পাওয়ার কাহিনীর মধ্য দিয়ে সত্যের জয় ঘোষিত হয়েছে। রূপকথার কাহিনি কাজলরেখায় লোকশিক্ষার কিছু উপাদান থাকায় সাধারণ মানুষের কাছে প্রিয় হয়েছে উঠেছিল বলে ধারণা করা যায়। গুনাইবিবির পালা জনপ্রিয় কাহিনির পুর্নবিন্যস্ত চিরত্ররূপ। চিত্রায়ণের প্রয়োজনে মূলকাহিনির কিছু বিচ্যুতি ঘটলেও তাতে প্রকৃত রস ও সুর নষ্ট হয়নি। এতে রূপায়িত প্রতিটি দৃশ্যই লোকজীবন থেকে নেয়। লোকগাথার রূপায়ণের কারনে গুনাইবিবি জনমনে আকর্ষণ করেছে। (সূত্র : বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের অতীত ও বর্তমান, কমল চৌধুরী, দৈনিক জনতা ১৭ জুলাই ২০১৮) ৯০ দশলে বেদের মেয়ে জোসনার জনপ্রিয়তার পেছনেও হয়তো বাঙালি দর্শকের ঐতিহ্যপ্রীতি ক্রিয়াশীল। সর্পবিশ্বাসও এই অঞ্চলের মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। লোকজ গানের সুর ও শারীরিক কসরত ও সর্বোপরি লোকজন জীববনের চিত্রায়ণী এই চলচ্চিত্র দর্শকপ্রিয়তা পাওয়ার কারণ হয়ে উঠেছে।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মানদীর মাঝির কাহিনী অবলম্বনে ১৯৫৯ সালে আখতার জং কারদার পরিচালিত উর্দুচলচ্চিত্র জাগো হুয়া সাভেরা নির্মিত। এটি আন্তর্জাতিক পরিম-লে পুরস্কৃত ও আলোচিত হলেও বাণিজ্যিকভাবে এটি সাফল্য অর্জন করেনি। এই চলচ্চিত্রের প্রধান সহাকারী হিসেবে কাজ করেন স্বাধীনতা উত্তরকালে গুম হওয়া জহির রায়হান। একই বছরে আবু নূর মোহাম্মদ এহতেশামুর রহমান যিনি এহতেশাম নামে ব্যাপক পরিচিতি নির্মাণ করেন গ্রামীণ পটভূমিতে ‘এদেশ তোমার আমার।’ ফতেহ লোহানীর ‘আকাশ আর মাটি’ এবং ১৯৫৯ সালে মহিউদ্দিনের ‘মাটির পাহাড়’-এই বছরের অন্যদুটি চলচ্চিত্র।

ফতেহ লোহানী (১৯২০-১৯৭৫) বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে অগ্রণী অভিনেতা ও চিত্রপরিচালক। চলচ্চিত্রকার বিমল রায়ের হিন্দি চলচ্চিত্র ‘হামরাহী’ (১৯৪৫)-তে অভিনয়ে করেন কিরণকুমার ছদ্মনামে। তিনি অভিনয় করেন রঙিলা আর্ট করপোরেশন প্রযোজিত উদয়ন চৌধুরী (ইসমাইল মোহাম্মদ) পরিচালিত ‘জোয়ার’ নাটকে এবং হিমাদ্রি চৌধুরী (ওবায়েদ-উল হক) পরিচালিত ‘দুঃখে যাদের জীবন গড়া’ (১৯৪৬) চলচ্চিত্রে। ঢাকা থেকে ১৯৪৯ সালে মাসিক সাহিত্য পত্রিকা অগত্যা প্রকাশে তিনি প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করেন। ঐ বছরই তিনি যোগ দেন করাচি বেতারে, পরে বিবিসিতে। ১৯৫৪ সালে ঢাকায় ফিরে তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গে জড়িত হন, পাশাপাশি বেতার অনুষ্ঠান, অভিনয় এবং লেখালেখিতেও অংশ নেন।

পরিচালনা ছাড়াও তিনি বেশ কিছু চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। তাঁর অভিনীত প্রথম চলচ্চিত্র ‘রাজা এলো শহরে’ (১৯৬৪)। ফতেহ লোহানী অভিনীত অন্যান্য চলচ্চিত্রের মধ্যে ‘মুক্তির বন্ধন’ (১৯৪৭), ‘তানহা’ (১৯৬৪), ‘বেহুলা’ (১৯৬৬), ‘ফির মিলেন্দে হাম দোনো’ (১৯৬৬), ‘আগুন নিয়ে খেলা’ (১৯৬৭), ‘দরশন’ (১৯৬৭), ‘জুলেখা’ (১৯৬৭), ‘এতটুকু আশা’ (১৯৬৮) ‘মোমের আলো’ (১৯৬৮), ‘মায়ার সংসার’ (১৯৬৯), ‘মিশর কুমারী’ (১৯৭০), ‘তানসেন’ (১৯৭০) প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। ষাটের দশকে সালাহ্উদ্দিনের ‘যে নদী মরূপথে’ (১৯৬১), ‘সূর্যস্নান’ (১৯৬২) ও ‘ধারাপাত’ (১৯৬৩) প্রভৃতি সামাজিক চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন।

‘মাটির পাহাড়’ চলচ্চিত্রটির কাহিনী, চিত্রনাট্য ও সংলাপ লিখেছেন সৈয়দ শামসুল হক। এটি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন থেকে নির্মিত প্রথম চারটি চলচ্চিত্রের একটি। ছবিটি প্রযোজনা করেছেন সৈয়দ মোহাম্মদ পারভেজ এবং পরিবেশিত হয় স্টার ফিল্ম ডিস্টিবিউটর্সের ব্যানারে। এতে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন কাফি খান, সুলতানা জামান, সুমিতা দেবী ও আনিস। চলচ্চিত্রটি ১৯৫৯ সালের ২৮ আগস্ট পূর্ব পাকিস্তানে মুক্তি পায়।

‘আকাশ আর মাটি’ এবং ‘মাটির পাহাড়’ কারিগরি মানের দিক থেকে ভালো হলেও বোম্বে ও লাহোরের চলচ্চিত্রের সঙ্গে লড়াই করে টিকতে পারেনি। ফতেহ লোহানীর ‘আসিয়া’ (১৯৬০) এবং এহতেশামের ‘রাজধানীর বুকে’ (১৯৬০) পঞ্চাশের দশকের উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র। ‘রাজধানীর বুকে’ চলচ্চিত্রটি বেশ জনপ্রিয় হয়। ‘আসিয়া’ বাবসায়িক সাফল্য না-পেলেও এটি প্রেসিডেন্ট পুরস্কার ও নিগার পুরস্কার লাভ করে। গ্রামবাংলার চিরায়ত দৃশ্য নিয়ে জীবনধর্মী এই চলচ্চিত্রটি বোদ্ধা মহলে গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে।

জহির রায়হান এই সময়ের উল্লেখযোগ্য পরিচালক। তাঁর ‘কখনো আসেনি’ (১৯৬১), ‘সোনার কাজল’ (১৯৬২, কলিম শরাফী সহযোগে), ‘কাচের দেয়াল’ (১৯৬৩), ‘সঙ্গম’ (উর্দু ১৯৯৪), ‘বাহানা’ (উর্দু, ১৯৬৫) এই সময়ের উজ্জ্বল সৃষ্টি। উর্দু চলচ্চিত্রের দিকে ঝুঁকেও তিনি আবার চোখ ফেরালেন লোকজ কাহিনীর দিকে। এরপর তিনি ‘আনোয়ারা’ (১৯৬৭) নির্মাণ করেন।

ষাটের দশকেই কীর্তিমান পরিচালক হিসেবে আবির্ভূত হন খান আতাউর রহমান (১৯২৯-১৯৯৭)। তিনি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে কেবল পরিচালক নন, অভিনেতা, কাহিনীকার, কণ্ঠশিল্পী, গীতিকার ও সুরকার হিসেবে খ্যাতিমান। তিনি ১৯৫০ সালে করাচি বেতারে চাকরি করতেন। এসময় ওস্তাদ জহুরী খানের কাছে সংগীতে তামিল নেন। সেখান থেকে চাকরি ছেড়ে দিয়ে তিনি লন্ডনে কিছুদিন শিক্ষাগ্রহণ করেন। ১৯৫৬ সালে ঢাকায় ফিরে এ. জে কারদারের জাগো হুয়া সাভেরা চলচ্চিত্রে প্রখ্যাত অভিনেত্রী তৃপ্তি মিত্রের সঙ্গে প্রধান চরিত্রে রূপদান করেন। ১৯৬৩ সালে তিনি অনেক দিনের চেনা চলচ্চিত্রের মাধ্যমে পরিচালক হিসেব আবির্ভূত হন। তাঁর পরিচালিত ‘রাজ সন্ন্যাসী’, ‘আবার তোরা মানুষ হ’, ‘সুজন সখী’, ‘দিন যায় কথা থাকে’, ‘এখনও অনেক রাত’ প্রভৃতি চলচ্চিত্র বাংলার চলচ্চিত্রকে উচ্চ আসনে প্রতিষ্ঠিত করে।

শেয়ার করুন

আপনার মতামত লিখুন :

আরও পড়ুন

“শুধু তোমার জন্য” তারেক আল মুনতাসির
পশ্চিম গগনে বাঁকা চাঁদ দেখলেই পবিত্র ঈদুল ফিতরের ঈদ
অপপ্রচার বন্ধ করে পাবর্ত্য চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষের কষ্ট প্রচার করুন
প্রচ্ছদকাহিনী: ভিক্ষুক সম্প্রদায়
সাংবাদিকদের কলম হোক দেশ ও মানুষের জন্য
অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান আর নেই

আরও খবর

সম্পাদক  প্রকাশক : এম শাহীন আলম।