শনিবার, ২৬ নভেম্বর ২০২২, ০৭:০৩ অপরাহ্ন
বিজ্ঞপ্তিঃ

হ্যাঁ, এলাকা আমার, খবর আমার, পত্রিকা আমার। সাফল্যের ২ বছর শেষে ৩ তম বছরে দৈনিক পার্বত্য কন্ঠ। নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে সবচেয়ে বেশি স্থানীয় সংস্করন নিয়ে "দৈনিক পার্বত্য কন্ঠ" বিশ্লেষন আমাদের, সিদ্ধান্ত আপনার। দৈনিক পার্বত্য কন্ঠ পত্রিকায় শুন্য পদে সংবাদদাতা নিয়োগ চলছে। আপনার এলাকায় শুন্য পদ রয়েছে কিনা জানতে কল করুনঃ 01647627526 অথবা ইনবক্স করুন আমাদের পেইজে। ভিজিট করুনঃ parbattakantho.com দৈনিক পার্বত্য কন্ঠ। সত্য প্রকাশে সাহসী যোদ্ধা আমরা নতুন বাংলাদেশ গড়বো

আদিবাসী নিয়ে ফের বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা

নিজস্ব প্রতিনিধি:
  • প্রকাশিত : শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০২০
  • ৪৮১ জন পড়েছেন

নিজস্ব প্রতিনিধি:

‘আদিবাসী’ নিয়ে ফের তর্ক শুরুর চেষ্টা চলছে। ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস ঘিরে এ বিতর্ক। এর দুই দিন আগে ৭ আগস্ট সরকার ‘আদিবাসী’ শব্দ ব্যবহার থেকে বিরত থাকার জন্য একটি নির্দেশনা জারি করে তথ্যবিবরণী প্রকাশ করে।

হারিয়ে যেতে থাকা কিছু রাজনৈতিক দল, যারা আওয়ামী লীগের তরীতে উঠে সরকারে আছে; তারা এটি উসকাচ্ছে বলে সরকারের নীতিনির্ধারক মহল মনে করছে। তাদের দাবি- দেশে ‘আদিবাসী’ নিয়ে বিতর্ক একেবারেই অহেতুক। তাদের মতে, যেখানে সংবিধানে পাহাড়ি ও সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীকে আদিবাসী বলা হয়নি, সেখানে এর বিপক্ষে অবস্থান কার্যত সংবিধান পরিপন্থী। দেশের নৃবিজ্ঞানীরা বলছেন, ‘আদিবাসী’ হিসেবে যারা দাবি করছেন; তাদের এ দাবির সপক্ষে যুক্তিতর্ক বেহুদা।

২০১১ সাল থেকেই আদিবাসী দিবস পালনে বাধা দিয়ে আসছে সরকার। তবে সেটি মানছে না ‘আদিবাসী কারবারিরা’। সরকারের মতের বিপক্ষে জনসংহতি সমিতি ও তাদের সহযোগী বেসরকারি সংস্থাগুলো। সন্তু লারমা জনসংহতি সমিতির পাশাপাশি বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামেরও সভাপতি। অন্য দিকে তাদের সহযোগী সিএইচটি কমিশনের কো-চেয়ারম্যান সুলতানা কামালও সরকারের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, সরকারের এমন সিদ্ধান্ত হাস্যকর।

সরকারের তরফে দেশে ‘আদিবাসী’ হিসেবে পাহাড়িদের মানা হয় না। তাদের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সংবিধানেও একই রকম কথা বলা হয়েছে। তবে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর নিজেদের ‘উপজাতি’ হিসেবে স্বীকার করে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতে সই করা সন্তু লারমা এখন সময়ের আবর্তে ‘আদিবাসী’ শব্দের ফেরি করছেন বলে অভিযোগ করছেন সরকারের কর্মকর্তারা।

নিজেদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য জনসংহতি সমিতির সহযোগী ও চাকমা রাজা ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায় জাতিসঙ্ঘে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। বাংলাদেশে ‘আদিবাসী’র অস্তিত্ব ইতিহাস স্বীকার না করলেও জাতিসঙ্ঘ আদিবাসী ফোরামের ঘোষিত সুবিধা পেতে দেশে ‘আদিবাসী’ হিসেবে পাহাড়িদের চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে এক দশকেরও বেশি ধরে। তবে সরকার বরাবরই বলে আসছে, বাংলাদেশে যারা নিজেদের এখন ‘আদিবাসী’ বলে দাবি করে আসছেন, তারা আদতে আদিবাসী নন।

পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক গবেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক আমেনা মোহসীন বলেছেন, নিজেদের ‘আদিবাসী’ বলে দাবি একটি কৌশলমাত্র।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১১ সালে সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন, ‘দেশে সাঁওতাল ছাড়া আর কোনো ‘আদিবাসী’ পরিচয় পাওয়ার মতো নৃগোষ্ঠী নেই’। তার এ বক্তব্যে বিুব্ধ হয়েছেন পাহাড়িদের নিয়ে বাণিজ্য অব্যাহত রাখা বিভিন্ন সংস্থা ও তাদের প্রতিনিধিরা। এর মধ্যে সুলতানা কামাল একজন।

অন্যদিকে কাপেং ফাউন্ডেশন নামে নতুন একটি সংস্থা, যেটি জনসংহতি সমিতির নেতাদের গঠন করা, তার নেত্রী নিনা লুসাই বলেছেন, তারা চাপিয়ে দেয়া কোনো পরিচয় মানবেন না। তাদের পরিচয় তারা ‘আদিবাসী’। তবে কিভাবে তারা এ ভূখণ্ডে আদিবাসী হয়েছেন, এ বিষয়ে তার জাতিসঙ্ঘের আদিবাসীবিষয়ক ফোরামের বক্তব্যে কোনো তথ্য নেই। বাংলাদেশের নৃতাত্ত্বিক বিষয়ের গবেষক ও ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. আবদুর রব বলেন, পাহাড়ে ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষ এসেছেন তিন শ’ থেকে সাড়ে তিন শ’ বছর আগে। সেখানে প্রথমে এসেছেন কুকিরা। তারা আট শ’ থেকে নয় শ’ বছর আগে এসেছেন। তারা সবাই এখানে অভিবাসী। তাদের কোনোভাবেই ‘আদিবাসী’ বলার সুযোগ নেই।

তিনি বলেন, হাকিসন, নিউইন ও অধ্যাপক অমরেন্দ্র লাল খীসাসহ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর এসব প্রতিনিধির লেখা তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করেই আমি এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে, এখানে কোনো আদিবাসী নেই।

অথচ অক্সফার্মের সাপোর্টে ২০১১ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের আদিবাসী’ গ্রন্থে জনসংহতি সমিতির প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক মঙ্গলকুমার চাকমা দাবি করছেন, চাকমরাসহ এসব ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী স্মরণাতীত কাল থেকে বাংলাদেশের এ ভূখণ্ডে বসতি স্থাপন করেছেন। তিনি যুক্তি হিসেবে জাতিসঙ্ঘের স্পেশাল রেপোর্টিয়ার জোসে মার্টিনেজের ‘ওয়ার্কিং ডেফিনেশন’ তুলে ধরেন।

জোসে এতে বলেন, ‘আদিবাসী বলতে তাদের বোঝায় যারা বহিরাগত কর্তৃক দখল বা বসতি স্থাপনের আগ থেকে নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের মূল অধিবাসীদের বংশধর।’

এ সংজ্ঞা ছাড়াও তিনি আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা ও বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন ব্যাখ্যা তুলে ধরে নিজেদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে দাবি করেন। তার মতে, ‘উপজাতি’ শব্দটি ঔপনিবেশিক শব্দ; যা ইউরোপীয়রা চালু করেছিল।
কিন্তু মঙ্গলকুমার চাকমারা এখন সেই ইউরোপীয়দের মাধ্যমে সরকারকে বাধ্য করতে চাইছেন তাদের ‘আদিবাসী’ পরিচয়টা নিশ্চিত করার জন্য।

অধ্যাপক ড. রবের কাছ এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘স্মরণাতীত কাল থেকে কোনো জায়গায় বসবাসকারীদের আদিবাসী বলা হয়।’ সেই হিসাবে বাঙালিরা পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী।

এ বিষয়ে তিনি বলেন, চাকমাদের আদিবাস ছিল কম্বোডিয়া ও থাইল্যান্ডের সীমান্তবর্তী মং থেমার এলাকা। সেখান থেকে তারা তাড়া খেয়ে আরাকানে আসেন। সেখান থেকে বান্দরবানে। পরে ধীরে ধীরে পুরো পাহাড়ি অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েন। বান্দরবানে তারা প্রায় তিন শ’ থেকে সাড়ে তিন শ’ বছর আগে বসতি স্থাপন করেছিলেন বলে জানান ড. রব।

তবে বান্দরবানের আলীকদমে চাকমারা বসতি স্থাপন করেছেন পঞ্চদশ শতাব্দীতে-এমন তথ্য জানিয়ে জনসংহতি সমিতির নেতা সজীব চাকমা ‘বাংলাদেশের আদিবাসী’ গ্রন্থে লেখেন, সেখানে তাদের প্রধান বসতি ছিল। পরে নানা কারণে চাকমারা আরো উত্তর দিকে সরে আসেন।

তিনি ঐতিহাসিক পটভূমি বর্ণনা করে বলেছেন, চাকমা কিংবদন্তিতে চাকমারা অতীতে চম্পকনগর নামে একটি রাজ্য বাস করতেন। যেটি বর্তমানে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের কাছাকাছি। সেখান থেকে তারা আরাকানে যান। সেখানে তাদের বলা হতো শাখ্যবংশীয় লোক। তাই তারা চাকমাদের সাক বা থেগ বলতেন।

এতে বলা হয়, গৌতম বুদ্ধের মৃত্যুর পর তারা ভারত থেকে বিতাড়িত হন এবং তিব্বত, নেপাল, কামরূপ (আসাম), সিয়াম (থাইল্যান্ড), জাভা ও সুমাত্রায় আশ্রয় নেন। তার পর সেখান থেকে তারা বাংলাদেশে আসেন।

তবে ‘আদিবাসী’ হিসেবে প্রমাণের জন্য পাহাড়িদের এসব যুক্তি নাকচ করে দিয়ে নৃ ও পুরাকীর্তি গবেষক আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া ‘বাঙালি নৃতাত্ত্বিক পরিচিতি’ গ্রন্থে লিখেছেন, বাংলাদেশে কোনো আদিবাসী নেই। গ্রন্থটির সপ্তম অধ্যায়ে লিখেন, ‘বাংলাদেশের উত্তর ও পূর্ব প্রত্যন্ত অঞ্চলের জেলাগুলিতে বিশেষ করে বৃহত্তর দিনাজপুর, রংপুর, ময়মনসিংহ, শ্রীহট্ট, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রভৃতি জেলায় অসংখ্য উপজাতির বসতি দেখা যায়। নৃতত্ত্বের বিচারে এরা সাধারণ বাঙালি হিন্দু ও মুসলিম অধিবাসী থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন সত্তার অধিকারী এবং তাদের দৈনন্দিন, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনও ভিন্ন ধরনের। এসব কারণে তাদেরকে উপজাতি বলা হয়ে থাকে।’

এতে তিনি বলেন, ‘তাদের মধ্যে কেউ কেউ নিজেদেরকে আদিবাসী বলে অভিহিত করতে চান এবং আদিবাসী বলতে কী বোঝায়, তা ভালো করে না জেনে অন্যরা তাদেরকে সমর্থনও করে থাকেন।’

গবেষক যাকারিয়া বলেন, ‘অপেক্ষাকৃত হাল আমলে (চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের এসব লোক তো পনেরো-ষোলো শতকের আগে এ দেশে আসেননি) এ দেশে আগত এসব মোঙ্গলীয় রক্তধারার মানুষেরা তো আন্তর্জাতিক সংজ্ঞা অনুসারে কোনো মতেই আদিবাসী হতে পারেন না। আদিবাসী মানুষের যে আন্তর্জাতিক সংজ্ঞা আছে তা অনুসরণ করলে তো কোনো মতেই এদেরকে আদিবাসী বলা যায় না। ’

জাতিসঙ্ঘের আদিবাসীবিষয়ক ঘোষণাপত্র মতে, আদিবাসী হিসেবে কাউকে স্বীকার করে নিলে তার জন্য সরকারের ওপর অনেক অধিকার বর্তায়। এর মধ্যে- ১. আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, ২. ভূমি ও ভূখণ্ডের ওপর অধিকার, ৩. আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি ও ভূখণ্ডের ওপর সামরিক কার্যক্রম বন্ধের অধিকার, ৪. মানবিক ও বংশগত (জেনেটিক) সম্পদসহ সাংস্কৃতিক অভিপ্রকাশের ওপর নিয়ন্ত্রণের অধিকার, ৫. আদিবাসীদের ভূমি ও ভূখণ্ডের ওপর থেকে তাদের জোর করে উচ্ছেদ থেকে রেহাই পাওয়ার অধিকার, ৬. সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও প্রথা চর্চা এবং পুনরুজ্জীবিতকরণের অধিকার, ৭. মাতৃভাষায় শিক্ষার অধিকার অন্যতম।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ
এই পোর্টালের কোনো খেলা বা ছবি ব্যাবহার দন্ডনীয় অপরাধ।
কারিগরি সহযোগিতায়: ইন্টাঃ আইটি বাজার
iitbazar.com